মোবাইল ফোন আমাদের দেশে একটি অসভ্য সংস্কৃতির ধারা বহন করে ফিরছে বিগত এক দশক। দিনে দিনে এই অসভ্যতা বাড়ছে, বেড়েই চলেছে, এর যেন কোনও আর থামাথামি নেই। মোবাইল ফোন আমাদের দেশে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক আব্রম্ন নষ্ট করেছে। এবং করেই চলেছে। এখন আর আমাদের নিজস্ব সময় বলে কিছু নেই। ভোররাত পাঁচটায়ও এখন ফোন আসে ব্যক্তিগত বা পরিবারগত কিছু কথা বলার জন্য। যে কথা আগের দিন হলে সকাল ১০টায় বলা যেত, সেই কথা ভোররাতে মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে এখন আমরা মোবাইল করে বসি। মোবাইল ফোন পুরো বাঙালি জাতিকে ইমপাল্সিভ একটি জাতিতে পরিণত করেছে। শুধু ইমপাল্সিভ নয়, প্যারানয়েডও। এই প্যারানয়া বা সন্দেহবাতিকতা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিনষ্ট করছে। স্ত্রী যদি দুবার মোবাইল করে স্বামীকে না পায় বা দু-দুবার স্বামীর মোবাইল এনগেজ্ড পায় তাহলেই তার মনে সন্দেহের ইলিবিলি শুরম্ন হয়ে যায়। তেমনি স্বামীর তরফেও এ কথা সত্য।
আবার বন্ধু বা কলিগদের ব্যাপারেও প্যারানয়া বা সন্দেহ বাতিকতা একটি বিশেষ স্থানজুড়ে বসেছে, অর্থাৎ যদি মোবাইলটি কেউ অন্য কোথাও ফেলে রেখে কোনও কাজে ব্যাপৃত হয় এবং ইতিমধ্যে যদি মোবাইল বাজতে থাকে, তাহলে বন্ধু বা কলিগের মনে সন্দেহের সাপ লাফ মেরে ওঠে, শালা, ইচ্ছে করে আমার মোবাইল ধরছে না! আমাকে অ্যাভয়েড করছে!
মোবাইল ফোন সর্বসাধারণের মধ্যে চালু হওয়ার পর থেকে সময়ের প্রতিও মানুষ শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেছে। আগে বয়স্ক কাউকে ফোন করার সময় মানুষ দুবার করে ভাবত ঠিক এই সময়ে তাকে ফোন করা উচিত কি না। অর্থাৎ উনি এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন কি না, কিংবা কোনও কাজে ব্যস্ত আছেন কি না, কিংবা সময়টা এখন তাকে ফোন করার জন্য উপযুক্ত কি না। এখন সেসবের কোনও বালাই নেই। একজন চ্যাংড়া মোবাইলধারী এখন বৃদ্ধ একজনকে রাত বারোটায় ঘুম থেকে জাগিয়ে সামান্য একটি সংবাদ জানায়, অর্থাৎ দিন হওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করতে পারে না। তার মনের ভেতরে ইমপালসিভিটি অর্থাৎ ভাবাবেগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আবার কাজের জায়গায় ব্যক্তিগত মোবাইলের হুড়োহুড়ি লেগে যায় প্রতিদিন। দিনের ওয়ার্কিং আওয়ারসের প্রতি মানুষের এখন শ্রদ্ধাবোধ কমে গেছে। সবকিছুই যেন এখন ট্রিভিয়াল, অর্থাৎ নগণ্য বা ছেলেখেলা। তাই যখন ইচ্ছে হচ্ছে বন্ধুকে মোবাইল করে জানানো হচ্ছে, বাজারে ভালো ইলিশ উঠ্ছে রে দোসত্ম, তাড়াতাড়ি কিইন্যা ফ্রিজ ভইরা ফ্যালাও। কী? তুমি এখন মিটিং-এ আছো? তয় ঠিক আছে। তবে দেরি কইরো না। বর্ষায় খিচুড়ি খাওনের শখ থাইকলে এই ফাঁকে...।
তো চলল এইসব প্যাঁচাল পাড়া। বহির্বিশ্বে যত প্রযুক্তিগত উন্নতি হচ্ছে, ততই মানুষের পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ কমে যাচ্ছে। এখন অফিসের পিয়নের সঙ্গে কথা বলার সময় পিয়নের মোবাইল বেজে ওঠে, বাসার কাজের লোকের সঙ্গে কথা বলার সময় তার মোবাইল বেজে ওঠে। এখন লং ডিসট্যান্স জার্নিতে, অর্থাৎ ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ যাওয়ার সময় বাসের ড্রাইভার মোবাইলে তার স্ত্রী বা বন্ধু বা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে যায়। এমনকি কোনও কোনও সময় মাত্র এক মুহূর্তের জন্য অ্যাক্সিডেন্টের হাত থেকে গাড়ির যাত্রীরা বেঁচে যায়। এখন চুলোর ওপর হাঁড়ি চাপিয়ে স্ত্রী তার স্বামীর অফিসে ফোন করে বলে, মাছ কি ভেজে রান্না করব, না কি তেল-মসলা দিয়ে এমনি চাপিয়ে দেব?
সেদিন এক কিশোরী আমার কাছে অভিযোগ করল সে এই যুগে আর বাঁচতে চায় না! কিশোরী বলল, যদি সে মধ্যযুগে জন্মাত তাহলে খুব খুশি হতো। সেইসব যুগে টেলিফোন ছিল না, রেডিও-টেলিভিশন ছিল না, কেবল টিভি ছিল না, সবচেয়ে বড় কথা মোবাইল ছিল না!
কিশোরীর মুখে এ কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন? কিশোরী বলল, আমি এত তাড়াহুড়ো, এত হইচই, এত কম্পিটিশনের জগৎ পছন্দ করি না। আমি প্রকৃতির মতো সহজ-সরল থাকতে চাই। আমি আমাকে জানতে চাই, চিনতে চাই। আমি আমার নিজের সময় চাই! এখন আমার মামি বাইরে কাজ করতে গিয়ে দিনের ভেতরে একশবার ফোন করে জিজ্ঞেস করে আমি ঠিক আছি কি না। আমি খেয়েছি কি না। গোসল করেছি কি না। কখনও মোবাইল না ধরলে সে হুলস্থূল কান্ড বাধায়। এখন বন্ধুরা একবার আমাকে মোবাইলে না পেলে অভিমান করে। বন্ধুদের মনের ভেতরে যখন যা ভাবনা হয় সঙ্গে সঙ্গে আমাকে সেটা তারা জানাবে। আমি জানি, তুমি বলবে, এটা তো খুব ভালো কথা। এর মানে হচ্ছে- তুমি কত পপুলার। কিন্তু না, আমি এই পপুলারিটি চাই না। আমি আমাকে চাই! আমি শান্তি চাই। নীরবতা চাই। যখন স্কুলে আছি ঠিক আছে, কিন্তু যখন আমি বাড়িতে, আমি নিজের মতো করে থাকতে চাই। কিন্তু কেউ আমার মনের কথা বোঝে না। মামি-ড্যাডি বোঝে না। ক্লাসের বন্ধুরা বোঝে না। শুধু মোবাইল, শুধু মোবাইল! এখন আমার মনে হয়। আমার বাড়িতেও যেন একটা স্কুল আছে। আমি এটা চাই না।
কিশোরীর কথা শুনে আমি তার উত্তর দিতে পারিনি। না, মোবাইল সে ত্যাগ করতে পারবে না। কারণ তার মা তার নিজের অফিস থেকে প্রতি আধঘণ্টা পর পর মোবাইল করেন। বাবা প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় মোবাইল করেন। বন্ধুরা তো আছেই।
তবে শেষ কথা হচ্ছে এখন মোবাইলের যুগ। প্রতিটি মানুষের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়াই এখন বিশ্ব বাজারের লক্ষ্য। তবে এই যুগ থাকবে না। মানুষ অচিরেই এই মোবাইল সংস্কৃতি পরিত্যাগ করবে। মানুষের মন ও আত্মাকে কোনওদিন কোনও মেশিন সন্তুষ্ট রাখতে পারবে না দীর্ঘদিন। এটা আমার বিশ্বাস।
|